বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, বাক্শক্তি ও শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা সরস্বতী। বাঙালির জীবনে সরস্বতী পুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি শিক্ষাজীবন, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক পবিত্র দিন। বিশ্বাস করা হয়, নিষ্ঠা ও শুদ্ধচিত্তে বাগ্দেবীর আরাধনা করলে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য, জ্ঞানবৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তির উন্নতি এবং কর্মক্ষেত্রে অগ্রগতির পথ সুগম হয়।
📅 ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার—সরস্বতী পুজো
এই দিনে পাড়া থেকে বাড়ি, বিদ্যালয়, কলেজ, ক্লাব ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—সর্বত্রই বিদ্যার দেবীর বন্দনা হবে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে হলুদ মেখে স্নান, শুদ্ধ পোশাক, পুষ্পাঞ্জলি—এই সমস্ত রীতির মধ্য দিয়েই বাঙালি সমাজ মা সরস্বতীর আশীর্বাদ কামনা করে।
তবে জ্যোতিষ ও শাস্ত্র মতে, এই পবিত্র দিনে কিছু কাজ কঠোরভাবে বর্জনীয়। অজান্তে এই ভুলগুলি করলে দেবীর কৃপা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা, কর্মজীবন ও মানসিক স্থিরতায় নানান বাধা আসতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক—সরস্বতী পুজোর দিনে কোন চারটি কাজ একেবারেই করা উচিত নয় এবং কেন।
🚫 ১. কালো বা লাল পোশাক পরিধান করা
জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী প্রতিটি দেবতার সঙ্গে নির্দিষ্ট রঙের কম্পন জড়িত।
মা সরস্বতীর প্রিয় রঙ—সাদা ও হলুদ, যা শুদ্ধতা, জ্ঞান, শান্তি ও সত্ত্বগুণের প্রতীক।
🔸 কালো রঙ তামসিক শক্তির প্রতীক
🔸 লাল রঙ রাজসিক প্রবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত
এই দুই রঙ সরস্বতী পুজোর দিনে পরিধান করলে দেবীর শক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। জ্যোতিষ মতে, এই দিনে কালো বা লাল পোশাক পরলে নেগেটিভ এনার্জি আকৃষ্ট হতে পারে, যার ফলে—
- পড়াশোনায় মন বসে না
- সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হয়
- মানসিক অস্থিরতা বাড়ে
👉 তাই এই দিনে সাদা বা হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি কিংবা সাধারণ পোশাকই শ্রেয়।
🚫 ২. বিদ্যা ও শিক্ষাসামগ্রীর অসম্মান করা
সরস্বতী পুজোর দিনটি মূলত বিদ্যার দিন।
এই দিনে বই, খাতা, কলম, বাদ্যযন্ত্র, নোটবুক—সবকিছুই দেবীর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
📌 শাস্ত্র মতে এই দিনে—
- বই বা খাতার উপর পা দেওয়া
- বাদ্যযন্ত্র অবহেলা করে রাখা
- পড়াশোনার সামগ্রী নোংরা জায়গায় রাখা
এই সবই গুরুতর দোষ হিসেবে গণ্য হয়।
বিশ্বাস করা হয়, এর ফলে—
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে
- পড়াশোনায় বাধা আসে
- বিদ্যাচর্চায় আগ্রহ কমে যায়
👉 এই দিনে অন্তত কিছুক্ষণ বইয়ের সামনে বসে মন থেকে দেবীর স্মরণ করাই শ্রেষ্ঠ আরাধনা।
🚫 ৩. কটু বাক্য, গালিগালাজ ও নিন্দা করা
মা সরস্বতী কেবল বিদ্যার দেবী নন—তিনি বাক্শক্তির দেবী। শাস্ত্রে বলা হয়, দেবী আমাদের জিহ্বায় বাস করেন। অর্থাৎ আমরা কী বলছি, কীভাবে বলছি—তা সরাসরি দেবীর সঙ্গে যুক্ত।
এই দিনে—
- কারও সঙ্গে রূঢ় আচরণ
- গালিগালাজ
- মিথ্যা কথা
- পরনিন্দা বা কটু বাক্য
এই সবই দেবীকে রুষ্ট করে।
জ্যোতিষ মতে, এর প্রভাবে—
- কথায় ভুল হয়
- মানুষ আপনাকে ভুল বোঝে
- ইন্টারভিউ, পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ব্যর্থতা আসে
👉 এই দিনে যতটা সম্ভব নীরব, সংযত ও মধুর ভাষায় কথা বলা অত্যন্ত শুভ।
🚫 ৪. বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা ও আলস্যে দিন কাটানো
সরস্বতী পুজোর দিনটি সকালের সূর্যালোকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শাস্ত্র মতে, ভোরবেলা উঠেই দেবীর আরাধনা করা শ্রেয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী—
“সরস্বতী পুজোর দিন বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকলে ভাগ্যও শুয়ে পড়ে।”
জ্যোতিষ দৃষ্টিতে এর কারণ—
- সূর্যোদয়ের সময়ে বুদ্ধি ও স্মৃতির গ্রহ সক্রিয় থাকে
- সেই সময় অলসতা মানে সুযোগ নষ্ট করা
এই দিনে দেরিতে ওঠা মানে—
- কর্মে গাফিলতি
- শিক্ষায় বাধা
- জীবনে জড়তা বৃদ্ধি
👉 তাই এই দিনে ভোরে উঠে স্নান করে দেবীর চরণে প্রণাম করা অত্যন্ত শুভ ফলদায়ক।
🌼 সরস্বতী পুজোর আসল শিক্ষা কী?
এই চারটি নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত অর্থ খুব গভীর—
✔️ শুদ্ধতা
✔️ শৃঙ্খলা
✔️ সংযম
✔️ বিদ্যার প্রতি শ্রদ্ধা
মা সরস্বতী আমাদের শেখান—
জ্ঞান মানে শুধু বইয়ের পাতা নয়,
জ্ঞান মানে আচরণ,
জ্ঞান মানে বাক্য,
জ্ঞান মানে জীবনযাপন।
২৩ জানুয়ারি ২০২৬, বসন্ত পঞ্চমীর দিনে, মা সরস্বতীর আরাধনা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। পোশাক, আচরণ, বাক্য ও মন—সব দিক থেকেই যদি আমরা শুদ্ধ থাকতে পারি, তবেই দেবীর কৃপা লাভ সম্ভব।
এই দিনে করা ছোট একটি ভুলও যেমন সাফল্যের পথে বাধা আনতে পারে, তেমনই একটি সঠিক আচরণ ভবিষ্যতের বহু দরজা খুলে দিতে পারে।
🙏 মা সরস্বতীর চরণে প্রণাম।
তিনি যেন আমাদের জ্ঞান দেন, কিন্তু অহংকার না দেন।
সাফল্য দেন, কিন্তু মানবিকতা কেড়ে নেন না।
জয় মা সরস্বতী।