হিন্দু ধর্মে ঠাকুরঘর শুধু পুজোর স্থান নয়, বরং সেটিকে বলা হয় ঘরের শক্তিকেন্দ্র (Energy Center)। বাস্তুশাস্ত্র ও জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, বাড়ির এই অংশ থেকেই পরিবারের মানসিক শান্তি, আর্থিক স্থিতি ও পারিবারিক সম্পর্কের উপর প্রভাব পড়ে।
আমরা অনেক সময় সৌন্দর্যের জন্য বা শখের বশে নানা ধরনের মূর্তি ঘরে এনে রাখি। কিন্তু শাস্ত্র বলছে—সব মূর্তিই ঠাকুরঘরে রাখার উপযুক্ত নয়। কিছু মূর্তি বাড়িতে নেগেটিভ এনার্জি, অশান্তি ও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন মূর্তি ঠাকুরঘরে রাখা নিষেধ এবং এর পেছনের আধ্যাত্মিক ও বাস্তুশাস্ত্রগত কারণ কী।
❌ ১. ভাঙা বা ফাটা মূর্তি — অশুভ সংকেত
বাস্তুশাস্ত্র মতে, ভাঙা কোনও জিনিসই বাড়িতে রাখা উচিত নয়, আর দেবমূর্তি হলে তো একেবারেই নয়।
🔹 ভাঙা মূর্তি মানে শক্তির বিচ্ছিন্নতা
🔹 এতে দেবশক্তির অবমাননা হয়
🔹 সংসারে হঠাৎ বাধা, অসুস্থতা ও আর্থিক সমস্যা দেখা দিতে পারে
অনেকে ভাবেন, পরে ঠিক করাবেন বলে রেখে দেন—কিন্তু ততদিন তা ঠাকুরঘর বা তার আশপাশে রাখা মহা অশুভ।
✅ করণীয়:
ভাঙা মূর্তি পবিত্র নদীতে বিসর্জন দিন বা মাটিতে পুঁতে দিন, কিন্তু অবহেলা করে ঘরে রাখবেন না।
❌ ২. হিংস্র বা উগ্র রূপের মূর্তি — মানসিক অস্থিরতার কারণ
ঘরে পুজোর উদ্দেশ্য হলো শান্তি, স্থিরতা ও স্নিগ্ধ শক্তি আনা। তাই দেবতাদের শান্ত রূপই ঘরে রাখা উচিত।
যেমন—
✔️ লক্ষ্মী শান্ত রূপে
✔️ কালী দক্ষিণাকালী রূপে
❌ চণ্ডী বা উগ্র তাণ্ডব রূপে নয়
হিংস্র রূপের মূর্তি রাখলে—
🔺 পারিবারিক কলহ বাড়ে
🔺 মন অস্থির থাকে
🔺 ঘুমের সমস্যা ও দুশ্চিন্তা বাড়তে পারে
বাস্তু মতে, এই ধরনের শক্তি বাড়ির পরিবেশে উত্তেজনা তৈরি করে।
❌ ৩. একই দেবতার একাধিক মূর্তি — শক্তির সংঘর্ষ
অনেকে বিশ্বাস করেন, বেশি মূর্তি মানে বেশি আশীর্বাদ। কিন্তু শাস্ত্র বলে ঠিক উল্টো।
একই দেবতার একাধিক মূর্তি রাখলে—
⚠️ শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়
⚠️ পূজার ফল কমে যায়
⚠️ মানসিক অস্থিরতা বাড়ে
ঠাকুরঘরে প্রতিটি দেবতার একটি করেই মূর্তি বা ছবি রাখা শ্রেয়।
❌ ৪. মুখোমুখি দুটি দেবমূর্তি — শক্তির দ্বন্দ্ব
দুটি মূর্তি যদি পরস্পরের দিকে মুখ করে থাকে, তাহলে—
🔻 শক্তির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়
🔻 সংসারে অকারণ মতবিরোধ দেখা দেয়
🔻 পূজার শক্তি সঠিকভাবে কাজ করে না
সব মূর্তির মুখ একই দিকে, সাধারণত পূর্ব বা উত্তর দিকে রাখা সবচেয়ে শুভ।
❌ ৫. শো-পিস ও দেবমূর্তির একসঙ্গে অবস্থান
অনেকে ঠাকুরঘরে সাজসজ্জার জন্য—
❌ পশুর মূর্তি
❌ নাচের ভাস্কর্য
❌ আধুনিক শো-পিস রাখেন
বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী, ঠাকুরঘর হল শুদ্ধ ও পবিত্র স্থান। এখানে কোনও ধরনের শৌখিন বা শৈল্পিক মূর্তি রাখা উচিত নয়। এতে দেবশক্তির সঙ্গে সাধারণ শক্তির মিশ্রণ ঘটে, যা আধ্যাত্মিকভাবে ক্ষতিকর।
❌ ৬. শোবার ঘরে বা রান্নাঘরে দেবমূর্তি
শাস্ত্র মতে—
🛏️ শোবার ঘরে দেবমূর্তি রাখলে মানসিক চাপ বাড়ে
🍳 রান্নাঘরে রাখলে অগ্নিতত্ত্বের সঙ্গে দেবশক্তির সংঘর্ষ হয়
ঠাকুরঘর আলাদা না থাকলে, অন্তত ঘরের শান্ত ও পরিষ্কার কোণে উঁচু স্থানে রাখাই উত্তম।
🌿 সঠিকভাবে ঠাকুরঘর রাখলে কী লাভ হয়?
যদি শাস্ত্রমতে ঠাকুরঘর রাখা হয়, তাহলে—
✨ সংসারে শান্তি বজায় থাকে
✨ আর্থিক স্থিতি আসে
✨ পরিবারের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ে
✨ মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়
✨ নেতিবাচক শক্তি দূরে থাকে
কারণ, তখন দেবশক্তির প্রবাহ সঠিকভাবে কাজ করে।
🔔 শেষ কথা
ঠাকুরঘর শুধু পুজোর জায়গা নয়, এটি আপনার বাড়ির আধ্যাত্মিক হৃদয়। সেখানে কী রাখা হচ্ছে, কীভাবে রাখা হচ্ছে—তা আপনার জীবনের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—
👉 শুদ্ধতা
👉 শাস্ত্রসম্মত নিয়ম
👉 শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস
সঠিক নিয়মে দেবতার আরাধনা করলে, দেবতাও কখনও মুখ ফিরিয়ে নেন না।