Skip to Content

এই বছর জানুয়ারিতেই বিদ্যার দেবীর আরাধনা

কবে পড়ছে সরস্বতী পুজো? তিথি, বিধি, নিষেধ, পৌরাণিক কাহিনি ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য - আচার্য জ্যোতিষ অধ্যাপক শ্রী জয়দেব শাস্ত্রী
20 January 2026 by
এই বছর জানুয়ারিতেই বিদ্যার দেবীর আরাধনা
জয়দেব শাস্ত্রী । ৫১কালিবাড়ি

বিদ্যা, জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সুরের আরাধনায় বছরের একটি বিশেষ দিন হল বসন্ত পঞ্চমী। এই দিনেই বাঙালির ঘরে ঘরে, বিদ্যালয়-কলেজে, সংগীতশালায় এবং শিল্পীর সাধনাস্থলে বন্দিত হন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। সাদা-হলুদ রঙের আবহ, আমের মুকুলের গন্ধ, দোয়াত-কলমের পবিত্রতা—সব মিলিয়ে এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি জ্ঞানচর্চার সামাজিক উৎসব।

এ বছর জানুয়ারিতেই বসন্ত পঞ্চমীর আবির্ভাব। ফলে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবক, শিল্পী ও শিক্ষক—সবার মধ্যেই রয়েছে আলাদা উত্তেজনা ও আবেগ।

📅 সরস্বতী পুজো ২০২৬: কবে ও কখন?

আগামী ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার সরস্বতী পুজো।

🔔 বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে

পঞ্চমী তিথি আরম্ভ

ইংরেজি: ২২ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার

বাংলা: ৮ মাঘ

সময়: রাত ২টা ৩০ মিনিট

পঞ্চমী তিথি শেষ

ইংরেজি: ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার

বাংলা: ৯ মাঘ

সময়: রাত ১টা ৪৭ মিনিট

🔔 গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মতে

পঞ্চমী তিথি আরম্ভ

ইংরেজি: ২২ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার

বাংলা: ৮ মাঘ

সময়: রাত ১টা ৩৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ড

পঞ্চমী তিথি শেষ

ইংরেজি: ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার

বাংলা: ৯ মাঘ

সময়: রাত ১২টা ২৭ মিনিট ২৮ সেকেন্ড

দুটি পঞ্জিকার হিসাবেই মূল আরাধনার দিন ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার

🌼 বসন্ত পঞ্চমী ও সরস্বতী পুজোর ঐতিহ্য

বসন্ত পঞ্চমী মানেই প্রকৃতির রূপান্তর। শীতের ক্লান্তি কাটিয়ে প্রকৃতি ধীরে ধীরে রঙিন হয়ে ওঠে। গাছে গাছে আমের মুকুল, সরষে ফুলের হলুদ আভা—সব মিলিয়ে এক নতুন সৃষ্টির বার্তা দেয় এই সময়। ঠিক এই কারণেই বিদ্যার দেবীর আরাধনার জন্য বসন্ত পঞ্চমীকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

বাঙালি সংস্কৃতিতে এই দিনটি ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খাতা, বই, কলম, বাদ্যযন্ত্র—সবকিছুই দেবীর সামনে অর্পণ করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। ছোট শিশুদের হাতে প্রথমবারের মতো খড়ি দেওয়া হয়, যা পরিচিত হাতেখড়ি নামে।

📜 পৌরাণিক কাহিনি: সরস্বতী দেবীর আবির্ভাব

পৌরাণিক মতে, সৃষ্টির শুরুতে বিশ্ব ছিল নির্জীব ও শব্দহীন। তখন ব্রহ্মার মনে হল—সৃষ্টিকে অর্থবহ করতে প্রয়োজন জ্ঞান ও ভাষা। ব্রহ্মার ধ্যান থেকে আবির্ভূত হলেন দেবী সরস্বতী। তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই সৃষ্টি পেল ভাষা, সুর ও ছন্দ।

বৈদিক যুগে সরস্বতী কেবল দেবী নন, তিনি ছিলেন একটি পবিত্র নদীর রূপও। সেই নদীর জল যেমন পবিত্র ও জীবনদায়ী, তেমনই দেবী সরস্বতীর জ্ঞান মানুষের মনকে শুদ্ধ করে।

পৌরাণিক বর্ণনায় দেবী শ্বেতপদ্মে উপবেশিত, চার হাতে বই, জপমালা, জলের পাত্র ও বীণা ধারণ করেন।

  • বই বিদ্যার প্রতীক
  • জপমালা জ্ঞানের ধারাবাহিক সাধনার চিহ্ন
  • জলের পাত্র সৃষ্টির ও শুদ্ধতার প্রতীক
  • বীণা সঙ্গীত ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন

এই প্রতীকগুলোই দেবী সরস্বতীর দর্শনের মূল ভিত্তি।

🪔 সরস্বতী পুজোর গুরুত্ব: কেন এই দিনটি বিশেষ?

সরস্বতী পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

জ্ঞান শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর আনার জন্য নয়,

জ্ঞান মানুষকে মানুষ করে।

এই পুজোর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হয় শৃঙ্খলা, বিনয় ও অধ্যবসায়। শিল্পীদের জন্য এটি সৃজনশীলতার উৎসব। শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাছে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার শপথ।

✅ কী করবেন: সরস্বতী পুজোর দিনে করণীয়

  1. ভোরে স্নান করে শুদ্ধ পোশাক পরুন।
    সম্ভব হলে সাদা বা হলুদ রঙের পোশাক বেছে নিন।
  2. পুজোর স্থানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
    দেবীর সামনে বই, খাতা, কলম, বাদ্যযন্ত্র সুন্দরভাবে সাজান।
  3. বসন্তের উপকরণ ব্যবহার করুন।
    আমের মুকুল, যবের শীষ, হলুদ ফুল, অভ্র ও আবির পুজোয় অন্তর্ভুক্ত করুন।
  4. বিদ্যার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করুন।
    পুজোর দিনে অন্তত কিছু সময় পড়াশোনা বা সৃজনশীল কাজে মন দিন।
  5. বড়দের আশীর্বাদ নিন।
    শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রণাম করুন—এটাই দেবীর প্রকৃত আরাধনা।

❌ কী করবেন না: যে কাজগুলি এড়িয়ে চলা উচিত

  1. পুজোর দিনে বই বা খাতার ওপর পা দেবেন না।
    এটি বিদ্যার অবমাননা বলে মনে করা হয়।
  2. অশুদ্ধ বা নোংরা পরিবেশে পুজো নয়।
  3. মিথ্যা, কটু কথা বা অহংকার এড়িয়ে চলুন।
    দেবী সরস্বতী বিনয় ও শুদ্ধতার প্রতীক।
  4. শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
    পুজো মানে শুধুই ফুল-ধূপ নয়, এটি মননের শুদ্ধতা।

🌱 পৌরাণিক মূল্যবোধ ও আধুনিক জীবনে তার প্রাসঙ্গিকতা

আজকের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে আমরা প্রায়ই জ্ঞানকে কেবল ক্যারিয়ারের হাতিয়ার হিসেবে দেখি। কিন্তু সরস্বতী পুজো আমাদের শেখায়—জ্ঞান মানে দায়িত্ব।

জ্ঞান যত বাড়বে, ততই বাড়বে বিনয়।

এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

শব্দের শক্তি আছে,

সুরের শক্তি আছে,

আর জ্ঞানের শক্তি সবচেয়ে বেশি।

🪷 উপসংহার

সরস্বতী পুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধির দিন। এই দিন আমাদের শিখিয়ে যায়—অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আলোর পথে হাঁটার শিক্ষা।

২৩ জানুয়ারি, বসন্ত পঞ্চমীর দিনে, দেবী সরস্বতীর চরণে প্রণাম জানিয়ে এই কামনাই করা যাক—

আমাদের জ্ঞান যেন অহংকার না আনে,

আমাদের বিদ্যা যেন মানবিকতা শেখায়,

আর আমাদের সৃজনশীলতা যেন সমাজকে আলোকিত করে।

জয় মা সরস্বতী।

এই বছর জানুয়ারিতেই বিদ্যার দেবীর আরাধনা
জয়দেব শাস্ত্রী । ৫১কালিবাড়ি 20 January 2026
Share this post
Tags
Archive