উপকরণ তো মাধ্যম, আসল ভক্তি আর বিনয়। কিন্তু কিছু জিনিস বাহ্যিক হয়েও শক্তিক্ষয় করে। সেই তিনটি ভুল নিয়েই আগে বলি।
১. তামার পাত্র ভুলেও ব্যবহার করবেন না
শনির পুজোয় তামার লোটা বা পাত্র দেখলেই আমার মন খারাপ হয়। কেন জানেন? সূর্য ও শনি— এঁরা পিতা-পুত্র হলেও তত্ত্বগত দিক থেকে বিপরীত মেরুর। সূর্য তামা ধাতু পছন্দ করেন, উনি প্রকাশ, রাজসিক তেজ আর অহমের প্রতীক। আর শনি লোহা পছন্দ করেন, উনি নীরব, স্থির, নিচুতলার মানুষের প্রতিনিধি। এখন সূর্যের ধাতু দিয়ে শনির অর্ঘ্য দিলে তাতে সম্মানের ভাবটা নষ্ট হয়।
সহজ নিয়ম: মাটির প্রদীপ, লোহার ছোট পাত্র, এমনকি স্টিলের পরিষ্কার পাত্র হলেও চলে। তবে মনটা যেন পরিষ্কার থাকে। মনে রাখবেন, প্রদীপে সর্ষের তেল বা তিলের তেল জ্বালাবেন, তাতেই আসল শক্তি।
২. লাল ফুল দেবেন না
এটা প্রায়ই শুনি, “মা-ঠাকুরের জন্য লাল গোলাপ আনি, ভালো লাগে।” কিন্তু শনি লাল রং নিতে চান না। লাল রং মঙ্গল গ্রহের, রক্তের, সংঘর্ষের, তাড়াহুড়োর। শনি ধীর, গভীর আর সহিষ্ণু। তাই লাল ফুল তাঁর পায়ে দিলে সেটা বেখাপ্পা হয়ে যায়। উনি গাঢ় নীল, কালো, বেগুনি বা সাধারণ দেশি ফুল পছন্দ করেন। নীল অপরাজিতা পাননি তো কী হয়েছে, শুধু ভক্তি মনে এনে ফুল ছাড়াই প্রণাম করুন, সেটাই শুদ্ধ।
৩. প্রতিমার চোখে সরাসরি তাকাবেন না
আপনি যখন শনি মন্দিরে বা পুজোর জায়গায় যান, একবার ভাবুন তো, বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে একদৃষ্টে তাকানো কি সমীচীন? শনির দৃষ্টি অত্যন্ত তীব্র। শ্রদ্ধা জানাতে হয় চোখ নিচু করে, তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে। এটা ভয় নয়, এটা বিনয়ের শিক্ষা। বিনয় ছাড়া শনিকে পাওয়া যায় না। মনে রাখবেন, শনি অহংকার ভাঙেন, মাথা নিচু না করলে কৃপা দেন না।
যখন শনি রুষ্ট হন, জীবনে কী দেখা যায়
জ্যোতিষ বলছে, সবার কেস আলাদা। কুণ্ডলী না দেখে কিছুই চূড়ান্ত বলা যায় না। তবু কিছু সাধারণ লক্ষণ থাকে, যা দেখে বুঝতে পারবেন শনির সতর্কবার্তা আসছে।
কঠোর পরিশ্রম করে ঠিক সময়ে ফল না পাওয়া।
ঋণ, বারবার খরচ, আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট।
মামলা-মোকদ্দমা বা শত্রুর উৎপাত।
হাড়ে-পিঠে-হাঁটুতে পুরনো ব্যথা, স্নায়ুর দুর্বলতা।
অকারণে মন খারাপ, একাকীত্ববোধ।
অফিসে বা কাজের জায়গায় সম্মানহানি।
শনি যখন এগুলো দেন, তিনি চান আপনি থামুন, ভাবুন। হয়তো কর্মে ভুল হচ্ছে, হয়তো কাউকে অসম্মান করেছেন, হয়তো দায়িত্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। শনি কখনও অকারণে কষ্ট দেন না। তাই বলি, ভয় পেয়ে ভুল প্রতিকার শুরু করবেন না, আগে নিজের ভুল ধরুন।
শনিবারের পুজোর সহজ ও শুদ্ধ নিয়ম
এতো কঠিন কিছু নয়। একটি আন্তরিক পরিবেশেই শনি তৃপ্ত হন।
পরিষ্কার স্নান করে কালো বা নীল (বেশি না পেলে সাদাও চলবে, তবে রং ঢং নয়) পরিষ্কার পোশাক পরে বসুন। সামনে রাখুন একটি মাটির প্রদীপ। সর্ষের তেল বা তিলের তেল দিন, সঙ্গে কিছু কালো তিল। প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রথমে ভগবান শিব বা হনুমানজির কথা ভাবুন, কারণ শিবই শনির একমাত্র আশ্রয়দাতা। তারপর শনিদেবের ধ্যান করুন— তিনি যেন নীলবর্ণ, কৃপাময়। চরণে প্রণাম জানান আর মনে মনে বলুন:
“হে শনিদেব, আজ থেকে আমি সত্য পথে থাকব, পরিশ্রমকে সম্মান করব, অহংকার করব না, দুর্বলের পাশে দাঁড়াব।”
এই সংকল্পটুকুই বড় বড় দানের চেয়ে ঢের বেশি মূল্যবান।
শনির মন্ত্র— ভক্তি করে জপ করবেন
মূল মন্ত্র:
ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ
এই মন্ত্র যত্ন করে উচ্চারণ করুন। শনিবার সন্ধ্যায় ১০৮ বার জপ করা চমৎকার ফল দেয়। যদি এত সময় না পান, ১১ বার বা ২১ বার হলেও ঠিক, কিন্তু প্রতিদিন বা প্রত্যেক শনিবার নিয়ম করে জপ করুন। একদিন জপ করে মাসখানেক ভুলে থাকলে তেমন কাজ হবে না।
আর একটি স্তব শোনাই, মন ভালো করে দেয়:
নীলাঞ্জন সমাভাসং রবিপুত্রং যমাগ্রজম্।
ছায়ামার্তণ্ড সম্ভূতং তং নমামি শনৈশ্চরম্।।
এটি পড়তে পড়তে মনে একটা গভীর শান্তি আসে, চেষ্টা করবেন।
সাড়েসাতি বা ঢাইয়া চললে কী করবেন
অনেকের মনে ভয়, “আমার তো সাড়েসাতি পড়েছে, সর্বনাশ হয়ে যাবে!” আমি বলি, ভয় নয়, এটা পরীক্ষার সময়। শনি এই সময়ে হিসেব নেন, কিন্তু পাশ করলে পুরস্কারও দেন। আমার দেখা অনেক মানুষ সাড়েসাতিতে অসম্ভব আধ্যাত্মিক উন্নতি করেছেন, জীবনদর্শন বদলেছে।
সাড়েসাতির সহজ প্রতিকার: শনিবার সন্ধ্যায় একটা মাটির প্রদীপে তিলের তেল দিয়ে অশ্বথগাছের নিচে রেখে আসুন, আর প্রার্থনা করুন,
“প্রভু, আমার ভুলগুলো মার্জনা করো, আমায় সৎপথে চলার শক্তি দাও।”
গাছ যেন নোংরা না হয়, নিরাপদ স্থানে দিন। আর প্রদীপ রাখলেন বলে ফল পাবেন, তা নয়; পাশাপাশি নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ, কর্মনিষ্ঠা আর দয়ার গুণ বাড়াতে হবে।
দান— নীরবে, নিষ্ঠায়
শনির জন্য শ্রেষ্ঠ দান কী কী?
কালো তিল
উড়দ ডাল
সর্ষের তেল
লোহার বাসন বা জিনিসপত্র
জুতো, ছাতা (যাঁর প্রয়োজন তাঁকে)
নীল/কালো বস্ত্র
খাবার
কিন্তু দানের সময় একটাই কথা মেনে চলবেন— পাতা ঝরার মতো কাউকে দেখাবেন না। শনির দান নীরব দান। রাস্তার ধারে কোনো শ্রমজীবী মানুষ, কোনো অসহায় বুড়ো মা-বাবা, কোনো খেটে খাওয়া মানুষ পেলে সামর্থ্য মতো দিয়ে দিন। মনে পড়বে, দান করার আগে পয়সা গুনবেন না, ভক্তি দিয়ে যা দেবেন তাই অমূল্য। আর নিজের সংসারের প্রয়োজন ফেলে রেখে বা ধার করে দান করা মোটেই ঠিক নয়।
পেশাগত বাধায় শনি পুজো
কর্মক্ষেত্রে সমস্যা, পদোন্নতি আটকে আছে? কাজ করেও স্বীকৃতি পাচ্ছেন না? এখানে শুধু পুজো যথেষ্ট নয়, সঙ্গে যোগ করতে হবে কাজের শৃঙ্খলা।
কাজ জমিয়ে রাখবেন না। সময়মতো শেষ করুন।
সহকর্মী বা জুনিয়রদের অবহেলা নয়।
অফিস পলিটিক্স এড়িয়ে চলুন, নিজের কাজে নিষ্ঠা রাখুন।
মিথ্যে প্রশংসা চাইবেন না, সৎ পরিশ্রমই শনিকে খুশি করবে।
আর হ্যাঁ, ধুতুরোর শিকড় ধারণ বা এমন কিছু নিজে নিজে করবেন না। বিষাক্ত জিনিস। গুরুর পরামর্শ ছাড়া অন্ধ প্রতিকার থেকে দূরে থাকাই ভালো।
রুদ্রাক্ষ ও রত্নধারণ
শনি শান্তির জন্য সাতমুখী রুদ্রাক্ষ বহুস্থানে বলা হয়। এটা ধারণ করতে পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন:
শনিবার বা সোমবার পরিষ্কার করে ধারণ করবেন।
“ওঁ নমঃ শিবায়” বা “ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ” জপ করে নেবেন।
আসল রুদ্রাক্ষ চিনতে শিখুন, ফেক প্রোডাক্ট নয়।
কুণ্ডলীর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সবার জন্য সব রত্ন বা রুদ্রাক্ষ নয়।