প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর ঠিক আগে বাংলার অসংখ্য বাড়িতে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।
পাড়ার মোড়ে, স্কুলের বারান্দায়, বাড়ির রান্নাঘরে কিংবা পরীক্ষার হলে ঢোকার আগের রাতেও সেই ফিসফাস—
“কুল খাসনি তো? পুজোর আগে কুল খেলে নাকি পরীক্ষায় ফেল হয়!”
এই একটি বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভয়, শৈশবের স্মৃতি, মা-ঠাকুমার সাবধানবাণী, সমাজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক এক অদ্ভুত মানসিক চাপ।
কেউ হাসি দিয়ে উড়িয়ে দেয়, আবার কেউ গোপনে আতঙ্কে কুলের দিকে তাকিয়েও মুখ ঘোরায়।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—
এই বিশ্বাসের আদৌ কোনো শাস্ত্রীয়, বৈদিক বা জ্যোতিষগত ভিত্তি আছে কি?
নাকি এটি কেবল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক মানসিক সংস্কার?
বসন্ত, কুল ও সরস্বতী পূজা: বিশ্বাসের ঐতিহাসিক পটভূমি
সরস্বতী পূজা হয় বসন্ত পঞ্চমীতে।
এই সময় প্রকৃতি নিজেই নতুন জীবনের বার্তা দেয়।
শীতের কঠোরতা ধীরে ধীরে সরে যায়, গাছে গাছে আমের মুকুল দেখা দেয়, মাঠে যবের শীষ দুলতে থাকে।
এই সময়েই বাজারে আসে শীতের শেষ ফল—কুল।
গ্রামবাংলায় কুল মানেই নতুন ঋতুর সূচনা।
কিন্তু ঠিক এখানেই তৈরি হয় দ্বন্দ্ব।
বসন্তের প্রথম ফল দেবীকে নিবেদন না করে আগে খেলে কি অমঙ্গল হয়—এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় নিষেধের ধারণা।
ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস বিদ্যার দেবীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
আর যেহেতু সরস্বতী পূজা মানেই পড়াশোনা ও পরীক্ষা—
তাই ভয়টা আরও গভীরভাবে ছাত্রছাত্রীদের মনে গেঁথে যায়।
শাস্ত্রের বিচারে: সত্যিই কি কুল নিষিদ্ধ?
সংবাদপত্রের অনুসন্ধানে প্রথমেই উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—
কোনো বেদ, পুরাণ, উপনিষদ, ধর্মশাস্ত্র বা স্মৃতিগ্রন্থে সরস্বতী পূজার আগে কুল খাওয়া নিষিদ্ধ—এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশ নেই।
না বৈদিক স্তোত্রে,
না পৌরাণিক কাহিনিতে,
না তন্ত্রশাস্ত্রে—
কোথাও এই নিষেধের লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অতএব শাস্ত্রীয় দৃষ্টিতে কুল খাওয়া নিজেই কোনো পাপ নয়।
এবং এর সঙ্গে পরীক্ষায় ফেল করার কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই।
তাহলে এই বিশ্বাস এল কোথা থেকে?
প্রথম কারণ: দেবীকে আগে, নিজেকে পরে
পুরনো বাঙালি সমাজে একটি গভীর মূল্যবোধ ছিল—
প্রকৃতির প্রথম দান আগে ঈশ্বরকে, পরে মানুষকে।
এই রীতি থেকেই অনেক পরিবারে বলা হতো—
“পুজোর আগে কুল খাস না।”
এটি নিষেধ নয়, বরং শ্রদ্ধা ও সংযমের শিক্ষা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিক্ষাই ভয়ের রূপ নেয়।
দ্বিতীয় কারণ: পরীক্ষার ভয় ও মানসিক শর্তায়ন
অনেক সময় দেখা যায়,
কেউ কুল খাওয়ার পর পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে সেই ঘটনাই গল্প হয়ে যায়।
আর যে শত শত ছাত্র কুল খেয়ে ভালো করে, তাদের কথা কেউ মনে রাখে না।
এই একপেশে অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয় মানসিক শর্তায়ন—
“কুল = ফেল।”
এটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের ফল, শাস্ত্রের নয়।
জ্যোতিষশাস্ত্র কী বলে?
জ্যোতিষ মতে বিদ্যা ও পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিনটি গ্রহ—
- বৃহস্পতি: জ্ঞান ও নৈতিকতা
- বুধ: বুদ্ধি ও বিশ্লেষণক্ষমতা
- চন্দ্র: মন ও মানসিক স্থিরতা
পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করে—
- গ্রহদশা
- একাগ্রতা
- আত্মবিশ্বাস
- মানসিক শান্তি
কোনো ফল খাওয়া বা না খাওয়ার সঙ্গে পরীক্ষার ফলের কোনো গ্রহগত সম্পর্ক নেই।
বরং জ্যোতিষ বলে—
ভয় চন্দ্রকে দুর্বল করে।
আর দুর্বল চন্দ্র মানেই অস্থির মন।
এই অস্থির মনই পরীক্ষার সময় ভুলের কারণ হয়।
বৈদিক দর্শনে সরস্বতীর প্রকৃত অর্থ
সরস্বতী কেবল একটি প্রতিমা নন।
তিনি প্রতীক—
জ্ঞান, ভাষা, সৃজনশীলতা এবং শুদ্ধ চিন্তার।
বৈদিক দর্শনে সরস্বতীর আরাধনা মানে—
অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা।
এখানে খাদ্যাভ্যাসের চেয়ে মনোভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যে মন ভয়ে ভরা,
সে মন বিদ্যার পাত্র হতে পারে না।
পরীক্ষায় ফেল হওয়ার বাস্তব কারণ
সংবাদপত্রের বিশ্লেষণে স্পষ্ট—
পরীক্ষায় ফেল হওয়ার কারণগুলো খুব সাধারণ এবং বাস্তব।
- নিয়মিত পড়াশোনার অভাব
- শেষ মুহূর্তের আতঙ্ক
- আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
- অতিরিক্ত কুসংস্কারে মন আটকে যাওয়া
কুল খাওয়া তার মধ্যে নেই।
হাজার হাজার ছাত্র আছেন যারা কুল খেয়েও কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছেন।
আবার এমনও আছেন, যারা কোনো নিষেধ না ভেঙেও ফেল করেছেন।
তাহলে কী করা উচিত?
বৈদিক দর্শন এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়।
- যদি আপনার মনে বিশ্বাস থাকে যে দেবীকে আগে অর্পণ করা উচিত—অপেক্ষা করুন।
- যদি কুল খাওয়া নিয়ে মনে ভয় তৈরি হয়—তাহলে আপাতত না খাওয়াই ভালো।
কারণ বৈদিক শাস্ত্র বলে—
যে কাজ মনকে অস্থির করে, তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
আধুনিক সময়ে এই বিশ্বাসের মূল্যায়ন
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় শত্রু কুল নয়।
সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অযৌক্তিক ভয়।
একজন ছাত্র যখন মনে মনে বলে—
“আমি ভুল করে কুল খেয়েছি, এবার নিশ্চয়ই ফেল”—
তখন সে নিজের মনোবল নিজেই নষ্ট করে ফেলে।
এই ভয়ই পরীক্ষার সময় হাত কাঁপায়,
ভুল করায়,
মনে ফাঁকা ভাব আনে।
কুল নয়, ভয়টাই আসল বাধা
সরস্বতী পূজার আগে কুল খেলে পরীক্ষায় ফেল—
এই ধারণার কোনো শাস্ত্রীয় বা জ্যোতিষগত ভিত্তি নেই।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—
সরস্বতী মানে বিদ্যা,
আর বিদ্যার প্রথম শর্ত হলো ভয়মুক্ত মন।
পরিশ্রম, একাগ্রতা ও আত্মবিশ্বাসই দেবীর প্রকৃত আরাধনা।
এই বসন্ত পঞ্চমীতে তাই একটাই প্রার্থনা হোক—
আমাদের মন যেন কুসংস্কারে নয়,
যুক্তি, জ্ঞান ও সাহসে ভরে ওঠে।
জয় মা সরস্বতী।