Skip to Content

বিরল পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ২০২৬: হোলির আবহে চুড়ামণি যোগ, তিন রাশির সতর্কবার্তা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের ৩ মার্চ, সোমবার সন্ধ্যায় আকাশে ঘটতে চলেছে বছরের প্রথম পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। তিন রাশির সতর্কবার্তা
28 February 2026 by
বিরল পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ২০২৬: হোলির আবহে চুড়ামণি যোগ, তিন রাশির সতর্কবার্তা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
জয়দেব শাস্ত্রী । ৫১কালিবাড়ি

ফাল্গুন পূর্ণিমার আবহে, রঙের উৎসবের প্রাক্কালে এই গ্রহণ ঘিরে জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান—উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়েছে। গ্রহণকালীন চাঁদের রক্তিম আভা, কথিত ‘চুড়ামণি যোগ’-এর সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি রাশির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ মহাজাগতিক পর্ব।

কী এই চন্দ্রগ্রহণ?

চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ একই সরলরেখায় অবস্থান করে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে। পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় চাঁদ সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর উম্ব্রা (গভীর ছায়া) অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই অবস্থায় চাঁদ তামাটে বা রক্তিম বর্ণ ধারণ করে—যা সাধারণভাবে “ব্লাড মুন” নামে পরিচিত।

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যালোকের নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে বেশি ছড়িয়ে দেয় এবং লাল আলোকে তুলনামূলকভাবে কম বিকৃত করে চাঁদের দিকে পৌঁছাতে দেয়। ফলে গ্রহণকালে চাঁদে গাঢ় লাল বা নীলচে-লাল আভা দেখা যায়।

৩ মার্চ ২০২৬: সময় ও পর্যায়

প্রাপ্ত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুযায়ী:

  • গ্রহণের সূচনা: বিকেল ৩:২০ মিনিট
  • গ্রহণ সমাপ্তি: সন্ধ্যা ৬:৪৬ মিনিট
  • ভারতে দৃশ্যমান পূর্ণগ্রাস পর্যায়: প্রায় ১৪–২০ মিনিট
  • চন্দ্রোদয়ের সময়: আনুমানিক সন্ধ্যা ৬:২৬–৬:৩২

এই গ্রহণকে “উদীয়মান চন্দ্রগ্রহণ” বলা হচ্ছে, কারণ অনেক স্থানে চাঁদ ওঠার সময়ই তা গ্রহণাবস্থায় থাকবে।

চুড়ামণি যোগ: জ্যোতিষীয় তাৎপর্য

বৈদিক জ্যোতিষ মতে, যখন পূর্ণিমা তিথিতে চন্দ্রগ্রহণ ঘটে, তখন একটি বিশেষ যোগ গঠিত হয়—যাকে চুড়ামণি যোগ বলা হয়। এই যোগকে শাস্ত্রে দ্বিমুখী প্রভাবসম্পন্ন ধরা হয়।

একদিকে এটি মানসিক অস্থিরতা, সিদ্ধান্তগত বিভ্রান্তি ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে; অন্যদিকে এই সময়ে দান, উপবাস, জপ ও আধ্যাত্মিক সাধনা বিশেষ ফলদায়ক বলে বিবেচিত হয়। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, গ্রহণকালে করা সৎকর্ম বহু গুণ ফলপ্রসূ হয়।

সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব: বিশ্বাস ও বিশ্লেষণ

জ্যোতিষীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, গ্রহণের প্রভাবে মানুষের মনোবৃত্তিতে পরিবর্তন আসতে পারে। অসন্তোষ, উত্তেজনা, বিতর্ক কিংবা অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে। কিছু মতবাদ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করে।

তবে এখানে স্পষ্ট করা জরুরি—এই ব্যাখ্যাগুলি জ্যোতিষীয় দর্শনের অংশ; বৈজ্ঞানিকভাবে চন্দ্রগ্রহণ ও সামাজিক ঘটনার সরাসরি কারণ-কার্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়।

কোন রাশির জন্য সতর্কতা?

জ্যোতিষীয় অবস্থান বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে যে গ্রহণটি সিংহ রাশিচক্রে ঘটবে। ফলে তিনটি রাশির জাতকদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:

  • সিংহ (Leo) – মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো এড়ানো প্রয়োজন।
  • কন্যা (Virgo) – আর্থিক বিষয়ে সতর্কতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরি।
  • মকর (Capricorn) – পারিবারিক বা পেশাগত সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সংযম প্রয়োজন।

প্রতিকারমূলক পরামর্শ (শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী)

  • গ্রহণের পূর্বে উপবাস বা সত্ত্বিক আহার
  • চন্দ্র মন্ত্র জপ
  • দরিদ্রদের খাদ্য ও বস্ত্র দান
  • শুদ্ধ স্নান ও প্রার্থনা

পূর্ণিমা উপবাস ও সূতক

পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী পূর্ণিমা তিথি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। গ্রহণ শুরুর প্রায় ৯ ঘণ্টা আগে সূতককাল আরম্ভ হয়—এই সময়ে মন্দির কার্য, শুভকর্ম ও রান্না পরিহারের প্রথা রয়েছে। গ্রহণোত্তর স্নান ও শুদ্ধিকরণ আচার পালন করা হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বনাম জ্যোতিষ: একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি


চন্দ্রগ্রহণ একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া—এতে আতঙ্কের কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। খালি চোখে গ্রহণ দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ (সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে যা নয়)।

অন্যদিকে, ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় গ্রহণকে আত্মসমীক্ষা, শুদ্ধি ও সাধনার বিশেষ সময় হিসেবে দেখা হয়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

উপসংহার

৩ মার্চ ২০২৬-এর পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ কেবল একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়; এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের এক মিলনক্ষেত্র। রক্তিম চাঁদের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেমন আমাদের বিস্মিত করবে, তেমনি আত্মসংযম, মানবিকতা ও সৎকর্মের বার্তাও স্মরণ করিয়ে দেবে।

সতর্কতা হোক বিচক্ষণতার সঙ্গে, আর দর্শন হোক আনন্দ ও জ্ঞানের আলোয়। আকাশে রক্তিম চাঁদ উঠবে—কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করবে, তা ভয়ের প্রতীক হবে, না কি আত্মজাগরণের।

বিরল পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ২০২৬: হোলির আবহে চুড়ামণি যোগ, তিন রাশির সতর্কবার্তা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
জয়দেব শাস্ত্রী । ৫১কালিবাড়ি 28 February 2026
Share this post
Tags
Archive