অলৌকিক জগতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরকালের। কেউ অন্ধকার ঘরে একা থাকতে গিয়ে হঠাৎ গা ছমছম করে ওঠার কথা বলেন, তো কেউ দাবি করেন পিঠের পেছনে কারও ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়েছে। বিজ্ঞান যেখানে এসবকে মানসিক দুর্বলতা বা ইলিউশন বলে উড়িয়ে দেয়, জ্যোতিষশাস্ত্র সেখানে একে ব্যাখ্যা করে গ্রহ-নক্ষত্রের সুনির্দিষ্ট প্রভাবে। সহজ কথায়, সবাই কিন্তু অশরীরী শক্তি অনুভব করেন না। জন্মগত কিছু গ্রহগত যোগ, মানসিক গঠন ও আচার-আচরণের সূত্র ধরেই বিশেষ কিছু মানুষ এই অনুভূতির সম্মুখীন হন। আসুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
মৃত্যুর পর আত্মার তিন অবস্থা: জীবাত্মা, প্রেতাত্মা, সূক্ষ্মাত্মা
শাস্ত্র বলছে, দেহত্যাগের পর আত্মা তৎক্ষণাৎ পরলোকে গমন করে না। তার মধ্যবর্তী একটি সময় থাকে, যেখানে আত্মা স্থূল ও সূক্ষ্ম জগতের মধ্যে বিচরণ করে। মৃত্যুর পর আত্মা প্রধানত তিনটি রূপ ধারণ করে:
১. জীবাত্মা: দেহে থাকাকালীন যে আত্মা প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয় ও মনের মাধ্যমে জগৎ অনুভব করে।
২. প্রেতাত্মা: যখন মৃত্যু স্বাভাবিক সময়ের আগে বা কোনও চরম অসম্পূর্ণতা (তীব্র লোভ, প্রতিহিংসা, অতৃপ্ত বাসনা) নিয়ে ঘটে, তখন আত্মা মুক্তি পায় না। সে প্রেতযোনিতে আটকে পড়ে এবং পার্থিব জগতেই ঘুরে বেড়ায়।
৩. সূক্ষ্মাত্মা: মুক্তির পথে থাকা বা উচ্চতর লোকগামী আত্মা, যা স্থূল জগতের টান কাটিয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, হত্যা কিংবা যে কোনও অকালমৃত্যু—এই সমস্ত ক্ষেত্রেই আত্মার পার্থিব বন্ধন সহজে ছেঁড়ে না। এই প্রেতাত্মাদের উপস্থিতিই মূলত ‘ভৌতিক অনুভূতি’ হিসেবে ধরা পড়ে। আর এই উপস্থিতি টের পাওয়ার ক্ষমতা জন্মগত কিছু জ্যোতিষ যোগের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে।
জ্যোতিষশাস্ত্র যা বলছে: রাহুই আসল কারিগর
গ্রহদের মধ্যে রাহুকে বলা হয় ‘ছায়া গ্রহ’। এর কোনও ভৌত দেহ নেই, অথচ এর প্রভাবে মানুষ ভ্রম, বিভ্রম, হঠাৎ ভয় ও অতিলৌকিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। জ্যোতিষে অশরীরী অনুভূতির জন্য দায়ী মূল যোগগুলো হলো:
লগ্নে রাহু: জন্মছকে যদি লগ্ন অর্থাৎ প্রথম ঘরে রাহু অবস্থান করে এবং তার ওপর শনি, মঙ্গল বা সূর্যের মতো ক্রূর গ্রহের দৃষ্টি বা যুতি থাকে, তাহলে জাতক ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত উপস্থিতি টের পান। অনেকেই নিয়মিত স্বপ্নে মৃত মানুষ দেখেন বা একা থাকলে কারও উপস্থিতি অনুভব করেন।
অষ্টম স্থানে রাহু: অষ্টম ঘর হলো মৃত্যু, রহস্য ও অজানা জগতের ঘর। এখানে রাহু বসে থাকলে এবং একইসঙ্গে শনি বা মঙ্গলের দৃষ্টি পেলে, সেই ব্যক্তির পক্ষে ভূত-প্রেতের কবলে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বিশেষত, রাত্রে বা নির্জন স্থানে এঁরা কেমন একটা অস্বস্তিকর চাপ অনুভব করেন।
দ্বাদশ স্থানে রাহু: দ্বাদশ ঘর মোক্ষ ও অচেতন মনের। এখানে রাহু থাকলে জাতক অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তবে কেতুর প্রভাব এতে মিশে গেলে তা আরও প্রকট হয়।
চন্দ্র ও বুধের ওপর রাহুর প্রভাব: মন (চন্দ্র) ও বুদ্ধির (বুধ) গ্রহ যদি রাহুর দ্বারা কলুষিত হয়, তাহলে জাতকের মস্তিষ্ক সহজেই নেতিবাচক তরঙ্গ গ্রহণ করে ফেলে। এর ফলে তাঁরা বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা ঝাপসা দেখতে থাকেন।
রাক্ষসগণ: একটি গুরুত্বপূর্ণ জন্মগত চিহ্ন
বৈদিক জ্যোতিষে ২৭টি নক্ষত্রকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে: দেবগণ, মনুষ্যগণ ও রাক্ষসগণ। যাঁরা রাক্ষসগণে জন্মেছেন (যেমন অশ্বিনী, মঘা, মূলা, শতভিষা, জ্যেষ্ঠা, রেবতী ইত্যাদি নক্ষত্রের কিছু চরণ), তাঁদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় স্বাভাবিকভাবেই তীক্ষ্ণ হয়। তাঁদের পক্ষে আশেপাশে থাকা নেতিবাচক শক্তির কম্পন বোঝা বা অশরীরী আত্মার উপস্থিতি টের পাওয়া সহজতর। এসব ব্যক্তির স্বপ্ন অনেক সময়ই ভবিষ্যদ্বাণীমূলক হয় এবং মৃত্যুর আগাম সংকেতও এঁরা পেতে পারেন।
যেসব মানসিক ও আচরণগত কারণ দায়ী
শুধু গ্রহ-নক্ষত্রই নয়, নিজস্ব মনন ও জীবনযাত্রাও একে প্রভাবিত করে। যাঁরা নিচের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাঁরা সহজেই অশরীরী শক্তির ‘টার্গেট’ হতে পারেন:
দুর্বল মানসিক শক্তি ও অতিরিক্ত ভীতি: ভয়ের কথা বারবার কল্পনা করা, হরর গল্পে ডুবে থাকা কিংবা সবসময় নেতিবাচক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকলে মনের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তখন অবচেতন মন বাস্তবের সঙ্গে অলীক জগতের যোগ স্থাপন করে ফেলে।
তীব্র আবেগপ্রবণতা ও সংবেদনশীলতা: অতিরিক্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিরা পরিবেশের সূক্ষ্ম শক্তি খুব সহজে ধরে ফেলেন। যাঁরা খুব সহানুভূতিশীল, তাঁদের ‘এমপ্যাথ’ বলেও চিহ্নিত করা হয়। এঁরা কোনও স্থানের ইতিহাস বা কোনও ব্যক্তির না-বলা কষ্ট বুঝতে পারেন।
পবিত্র তিথিতে নিষিদ্ধ কাজ: একাদশী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চতুর্দশী ইত্যাদি তিথিতে চন্দ্রের শক্তি বিশেষভাবে প্রবল থাকে। এই সব দিনে পাপকর্ম, মদ্যপান, অকারণে রাত জাগা, কবরস্থান বা শ্মশানে অহেতুক ঘোরা ইত্যাদি করলে কুশক্তির প্রভাব দ্রুত গ্রাস করে। অমাবস্যায় পিতৃপক্ষের সময় তো আত্মার অবস্থান পার্থিব জগতে আরও ঘনীভূত হয়।
অনুভূতির পেছনে গ্রহের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা
একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, শুধু রাহুই নয়, অন্যান্য গ্রহও এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে:
শনি: দীর্ঘস্থায়ী ভয়, দুঃস্বপ্ন ও হতাশা এনে দেয়, যা ভয়ের মাত্রা বাড়ায়।
কেতু: পূর্বজন্মের স্মৃতি, ডিটাচমেন্ট ও মোক্ষের গ্রহ। এর প্রভাবে মানুষ অজানা আধ্যাত্মিক টান অনুভব করে, কখনও কখনও যা ভৌতিক অভিজ্ঞতা বলে ভুল হয়।
মঙ্গল: অগ্নিগ্রহ। যদি অষ্টম বা দ্বাদশে মঙ্গল পীড়িত থাকে, তাহলে হঠাৎ দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পর আত্মার উপস্থিতি টের পাওয়ার ঘটনা ঘটে।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?
আপনার যদি মনে হয়, এই লক্ষণগুলো আপনার মধ্যে রয়েছে, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছু আধ্যাত্মিক নিয়ম মেনে চলতে পারেন:
১. প্রতিদিন হনুমান চল্লিশা বা নারায়ণ কবচ পাঠ করুন।
২. রাহু মন্ত্র (ওঁ ভ্রাং ভ্রীং ভ্রৌং সঃ রাহবে নমঃ) জপ করতে পারেন, বিশেষত শনিবার ও মঙ্গলবার।
৩. অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় রাতে একা বাইরে বেরোবেন না।
৪. রাত্রে মাথার কাছে লোহা বা পিতলের কোনও বস্তু রেখে ঘুমান।
৫. বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণ (ঈশান কোণ) পরিষ্কার রাখুন ও সেখানে প্রদীপ জ্বালান।
পরিশেষে মনে রাখবেন, অশরীরী উপস্থিতি মানেই ভয়ের কিছু নয়। অনেক সময় তা আমাদের নিজেদের অবচেতনেরই খেলা, কিংবা পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদপূর্ণ সংকেত। গ্রহ-নক্ষত্রের এই খেলা বোঝার মাধ্যমেই আমরা ভয়কে জয় করতে পারি এবং নিজের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারি।