আমাদের সনাতন ভারতীয় ও বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বছরে মোট ১২টি সংক্রান্তি হয়। কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র সংক্রান্তি হল মকর সংক্রান্তি। কারণ এই দিন সূর্যদেব ধনু রাশি ছেড়ে মকর রাশিতে প্রবেশ করেন, যাকে বলা হয় উত্তরায়ণের সূচনা। শাস্ত্র মতে, উত্তরায়ণ দেবতাদের দিন, অর্থাৎ এই সময় থেকে শুভ শক্তির প্রভাব বাড়তে শুরু করে।
👉 ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার পালিত হবে মকর সংক্রান্তি।
এই দিন শুধু উৎসব বা পিঠে-পুলির দিন নয়, বরং আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি তিথি। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে করা ছোট ছোট কিছু উপায়ও ভবিষ্যতের বড় বাধা দূর করতে সাহায্য করতে পারে।
☀️ ১) সূর্যদেবকে অর্ঘ্য দিন — দূর হবে দুঃখ ও রোগ
মকর সংক্রান্তির প্রধান দেবতা হলেন সূর্যদেব। এই দিন সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া অত্যন্ত শুভ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
🔸 কীভাবে অর্ঘ্য দেবেন:
- একটি তামার পাত্রে গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল নিন
- তাতে দিন লাল ফুল, লাল চন্দন, আতপ চাল
- সূর্যের দিকে মুখ করে জল ঢালুন এবং মনে মনে প্রার্থনা করুন
👉 চাইলে কালো তিল মিশিয়েও অর্ঘ্য দিতে পারেন, এতে শনিদোষ ও কর্মফলজনিত বাধা কমে বলে বিশ্বাস।
উপকার:
- স্বাস্থ্য ভালো থাকে
- চোখ ও হাড়ের সমস্যা কমে
- আত্মবিশ্বাস বাড়ে
- কর্মক্ষেত্রে উন্নতি হয়
🍘 ২) তিলের ভোগ নিবেদন করুন — ঘরে আসবে সমৃদ্ধি
পৌষ সংক্রান্তিতে তিল অত্যন্ত শুভ বস্তু হিসেবে ধরা হয়। কারণ তিলকে শনিদেব ও পিতৃপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
🔸 কী করবেন:
- বাড়ির পুজোর সময় ভগবানকে তিলের নাড়ু, তিলের পিঠে বা তিলের লাড্ডু ভোগ দিন
- পরে পরিবারের সবাই প্রসাদ গ্রহণ করুন
উপকার:
- পারিবারিক অশান্তি কমে
- অর্থনৈতিক স্থিতি আসে
- পিতৃদোষ প্রশমিত হয়
⚫ ৩) কালো তিল খান ও দান করুন — কেটে যাবে বাধা
মকর সংক্রান্তির দিনে কালো তিল খাওয়া ও দান করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে জ্যোতিষশাস্ত্রে বলা হয়েছে।
🔸 কী করবেন:
- সকালে বা দুপুরে খাবারের সঙ্গে সামান্য কালো তিল খান
- সম্ভব হলে দরিদ্র বা প্রয়োজনে থাকা মানুষকে কালো তিল দান করুন
উপকার:
- শনিদেবের কৃপা লাভ হয়
- কর্মজীবনের বাধা কমে
- দীর্ঘদিনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
🥗 ৪) নিরামিষ আহার ও শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন
এই পবিত্র দিনে মন ও শরীর দুইই শুদ্ধ রাখা জরুরি।
🔸 কী করবেন:
- নিরামিষ খাবার গ্রহণ করুন
- ঝগড়া, রাগ, কটু কথা এড়িয়ে চলুন
- বাড়িতে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন
উপকার:
- মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়
- সংসারে সুখ বজায় থাকে
- পজিটিভ এনার্জি বৃদ্ধি পায়
🐄 ৫) গরুকে রুটি ও গুড় খাওয়ান — পূর্ণ হবে মনস্কামনা
গরুকে সনাতন ধর্মে মাতৃরূপে দেখা হয়। মকর সংক্রান্তির সকালে গরুকে খাদ্য দান করা অত্যন্ত শুভ।
🔸 কী করবেন:
- সকালে স্নান সেরে গরুকে রুটি ও গুড় খাওয়ান
- মনে মনে নিজের ইচ্ছার কথা বলুন
উপকার:
- পরিবারে সুখ আসে
- সন্তান ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা কমে
- ভাগ্য সহায় হয়
🤝 ৬) অতিথিকে খালি হাতে ফেরাবেন না
এই দিন দান ও আতিথেয়তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
🔸 কী করবেন:
- কেউ বাড়িতে এলে তাকে কিছু না কিছু মিষ্টি বা ফল দিন
- খালি মুখে কাউকে ফেরাবেন না
উপকার:
- সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা বজায় থাকে
- আর্থিক সংকট কাটে
🍬 ৭) চিনি, মিছরি, আলু ও লঙ্কা দান করুন — আসবে সাফল্য
এই চারটি জিনিস দান করলে কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসায় সাফল্য বাড়ে বলে শাস্ত্রে বলা হয়েছে।
🔸 কী করবেন:
- দরিদ্র, মন্দির বা গরিব মানুষকে এগুলি দান করুন
উপকার:
- আটকে থাকা কাজ এগোয়
- চাকরি ও ব্যবসায় উন্নতি
🧈 ৮) ঘি, চাল, ময়দা ও দই দান করুন — কাটবে জীবনের বড় বাধা
এই দানগুলি জীবনের বড় সমস্যার প্রতিকার হিসেবে ধরা হয়।
🔸 কী করবেন:
- সম্ভব হলে এই চারটি দ্রব্য একসঙ্গে দান করুন
উপকার:
- ঋণ সমস্যা কমে
- ভাগ্যোন্নতি হয়
- সংসারে স্থায়িত্ব আসে
💧 ৯) সকালে সারা বাড়িতে গঙ্গাজল ছিটান
এই দিনে বাড়ির নেগেটিভ এনার্জি দূর করার জন্য গঙ্গাজল অত্যন্ত কার্যকর।
🔸 কী করবেন:
- সকালে স্নানের পর বাড়ির সব ঘরে গঙ্গাজল ছিটান
- তুলসী বা পুজোর ঘরে বিশেষভাবে দিন
উপকার:
- অশুভ শক্তি দূর হয়
- ঘরে পজিটিভ শক্তি বৃদ্ধি পায়
🌊 ১০) গঙ্গাস্নান ও দান — মহাপুণ্যের যোগ
যাঁরা পারবেন, তাঁদের জন্য মকর সংক্রান্তির দিনে গঙ্গাস্নান ও দান অত্যন্ত মহাপুণ্যের কাজ।
🔸 কী করবেন:
- গঙ্গাস্নান করে সাধ্যমতো দান করুন
- না পারলে বাড়িতে স্নান করে দান করলেও শুভ ফল মেলে
উপকার:
- পাপক্ষয় হয়
- পিতৃপুরুষের আশীর্বাদ লাভ হয়
- ভবিষ্যতের কষ্ট কমে
🌟 শেষ কথা
মকর সংক্রান্তি শুধু উৎসবের দিন নয়, এটি একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক তিথি, যেখানে সামান্য বিশ্বাস ও সৎ মন নিয়ে করা কাজও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, উপায়ের সঙ্গে সঙ্গে সৎ কর্ম ও সঠিক আচরণই আসল প্রতিকার।
👉 এই মকর সংক্রান্তিতে যদি আপনি মন থেকে প্রার্থনা করেন এবং কিছু দান-উপকার করেন, তবে সূর্যদেব ও শনিদেব — দুজনেরই কৃপা লাভের যোগ তৈরি হয়।