বাচ্চার মেজাজ দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে?
এটা কি শুধু আবেগের পরিবর্তন, নাকি পেছনে কাজ করছে নজরদোষ বা কুনজরের প্রভাব? জেনে নিন লক্ষণ, কারণ ও প্রচলিত আধ্যাত্মিক প্রতিকার
ঠাকুরমা-দিদিমাদের মুখে আমরা প্রায়ই শুনেছি—
“ওরে, বাচ্চাটার নজর লেগেছে” অথবা
“আজকাল সব কাজে কেমন বাধা আসছে, মনে হয় কুনজর পড়েছে”।
শুনতে হয়তো এটি কুসংস্কারের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের লোকসংস্কৃতি, তন্ত্রধারা, পুরাণ ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে ‘নজরদোষ’ বা ‘কুনজর’-এর ধারণা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে।
আধুনিক বিজ্ঞানে এর কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকলেও, আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় বলা হয়—
নজরদোষ আসলে এক ধরনের নেতিবাচক শক্তির প্রভাব, যা কারও ঈর্ষা, হিংসা, কুদৃষ্টি বা অতিরিক্ত নজরের কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য ব্যক্তির জীবনে বাধা, অশান্তি ও রোগভোগ ডেকে আনতে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং মানসিকভাবে দুর্বল মানুষরা এই নেতিবাচক শক্তির প্রতি বেশি সংবেদনশীল বলে মনে করা হয়।
শিশুদের উপর নজরদোষের সম্ভাব্য লক্ষণ (লোকবিশ্বাস অনুযায়ী)
অনেক সময় দেখা যায়, কোনও সুস্থ ও হাসিখুশি বাচ্চা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। যেমন —
- অকারণে কান্নাকাটি বা বিরক্তি
- অতিরিক্ত জেদ ও খিটখিটে মেজাজ
- খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা
- হঠাৎ ভয় পেয়ে যাওয়া বা আঁতকে ওঠা
- গভীর রাতে ঘুম না হওয়া বা দুঃস্বপ্ন দেখা
- বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া
- শরীরে অকারণ দুর্বলতা
এই সব উপসর্গ অনেক সময় নজরদোষের লক্ষণ বলে ধরা হয় লোকজ সংস্কৃতিতে।
তবে এটাও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এগুলোর পেছনে —
- শারীরিক অসুস্থতা
- মানসিক চাপ
- খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা
-
বা পারিপার্শ্বিক কারণ
থাকাও একেবারেই অস্বাভাবিক নয়।
তাই কোনও সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে যাঁরা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে আস্থা রাখেন, তাঁদের জন্য সমাজে প্রচলিত আছে কিছু সহজ টোটকা ও লোকাচারমূলক প্রতিকার।
নজরদোষ কাটানোর প্রচলিত কিছু আধ্যাত্মিক উপায় (লোকাচার অনুসারে)
১. নারকোলের মালা ও কু-দৃষ্টি প্রতিরোধ
একটি নারকোলের মালা কালো কাপড়ে জড়িয়ে বাড়ির সদর দরজার উপরে ঝুলিয়ে রাখলে বাড়ির ভিতরে নেতিবাচক শক্তির প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
কালো রংকে বহু সংস্কৃতিতে নেগেটিভ এনার্জি শোষণের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। নারকোল আবার পবিত্রতার প্রতীক।
➡ বিশেষ করে নতুন বাড়ি, দোকান, অফিস বা শিশুর নতুন জীবনের অধ্যায় (প্রথম জন্মদিন, নামকরণ, স্কুলে ভর্তি) শুরু হওয়ার সময় এই প্রথাটি বহু পরিবার পালন করে।
২. সর্ষের তেল ও সলতে টোটকা (বিশেষত শিশুদের জন্য)
সর্ষের তেলকে বহু ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আচারেই শুদ্ধ ও শক্তিশালী উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
তুলো দিয়ে একটি লম্বা সলতে বানিয়ে তাতে সর্ষের তেল লাগাতে হয়। তারপর যে ব্যক্তি বা শিশুর উপর নজরদোষ পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তার মাথার চারদিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ৭ বার ঘোরানো হয়।
পরে সেই সলতেটি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং ছাই কোনও প্রবাহিত জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এতে নেতিবাচক শক্তি দগ্ধ হয়ে যায় এবং মনের ভার হালকা হয়।
৩. শনিবার কাঁচা দুধের টোটকা (গ্রহশান্তির জন্য)
শনিবার দিনটি শনি গ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত। শনি গ্রহকে কর্মফলের ও দুঃখ-দুর্দশার কারণও বলা হয়। তাই এদিন কাঁচা দুধ দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়া করলে দৃষ্টিদোষ ও গ্রহদোষ কমে বলে মনে করা হয়।
এই বিশ্বাস অনুযায়ী—
- শনিবার সকালে
- আক্রান্ত ব্যক্তির মাথার চারপাশে
- কাঁচা দুধ ৭ বার ঘোরাতে হয়
- এবং পরে তা কোনও নদী বা প্রবাহিত জলে ফেলে দিতে হয়
এতে মন ও শরীরে শান্তি ফিরে আসে বলে বিশ্বাস।
৪. ফটকিরি, নুন ও কালো সর্ষে দিয়ে গৃহশুদ্ধি
এই তিনটি উপাদানকেই আধ্যাত্মিক জগতে নেগেটিভ এনার্জি কাটার শক্তিশালী উপাদান মনে করা হয়।
একটি পাত্রে নিয়ে নিন—
- ফটকিরি
- নুন
- কালো সর্ষে
এই মিশ্রণটি বাড়ির চারদিক ঘুরিয়ে নিয়ে পরে বাড়ির বাইরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্বাস অনুযায়ী, এতে বাড়ির চারপাশের সমস্ত কু-দৃষ্টি ও বাধা দূর হয়ে যায়।
বিশেষ করে —
- দীর্ঘদিন অসুস্থতা
- পারিবারিক কলহ
- আর্থিক ক্ষতি
- বা ঘনঘন দুর্ঘটনার পরে
এই প্রথাটি বেশি পালন করা হয়।
৫. শুকনো লঙ্কার টোটকা (সবচেয়ে জনপ্রিয়)
শুকনো লঙ্কা বহুদিন ধরেই নজরকাটার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৫টি শুকনো লঙ্কা নিয়ে মাথার চারপাশে ৫ বার ঘোরানো হয় এবং পরে বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয়।
বিশ্বাস করা হয় —
যদি বেশি ধোঁয়া বা শব্দ হয়, তাহলে বুঝতে হবে নজরদোষ ছিল প্রবল।
এই টোটকাটি শিশু, যুবক, বৃদ্ধ — সকলের ক্ষেত্রেই প্রচলিত।
সবশেষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা
নজরদোষ, কুনজর বা নেগেটিভ এনার্জি — এই বিষয়গুলো মূলত মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ধারণার অংশ।
তবে কোনও সমস্যা দেখা দিলে কেবল টোটকার উপর নির্ভর না করে —
✅ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
✅ শিশুর শারীরিক ও মানসিক যত্ন নিতে হবে
✅ ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে
✅ নিয়মিত প্রার্থনা ও ধ্যান করতে হবে
মনে রাখবেন —
সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষাকবচ হলো আপনার নিজের মন, আপনার ঘরের পরিবেশ এবং আপনার ভাবনা।
যেখানে আলো আছে, সেখানে অন্ধকার টিকে থাকতে পারে না।
🌿 ইতিবাচক চিন্তা
🌿 বিশুদ্ধ মন
🌿 সুস্থ খাদ্য
🌿 নিয়মিত প্রার্থনা
এগুলোই সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক শক্তি।