আজকাল রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ বিরাজ করছে, তার মূল কারণ কি শুধুই বৈশ্বিক পরিস্থিতি, নাকি এর পিছনে আরও গভীর কোনও জ্যোতিষিক কারণ আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা কথা বলেছি খ্যাতনামা জ্যোতিষী ও গবেষক জয়দেব শাস্ত্রীর সঙ্গে। তিনি শাস্ত্রীয় জ্ঞান, সংখ্যাতত্ত্ব এবং বর্তমান গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল অবস্থান বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন এই সংকটের স্থায়িত্বকাল এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
২০২৬ সাল: উগ্রতা ও অস্থিরতার ইঙ্গিত
প্রথমেই জয়দেব শাস্ত্রী জানান, সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে ২০২৬ সাল সূর্যের বছর। তবে বিক্রম সম্বৎসর অনুযায়ী এটি ২০৮৩ সাল, যা রুদ্র সম্বৎসর বা রাগ ও উগ্রতার বছর হিসেবে চিহ্নিত। জ্যোতিষশাস্ত্রে এই ধরনের বছরকে অশান্তি, আকস্মিক পরিবর্তন এবং ধ্বংসাত্মক শক্তির উত্থানের সময় বলে মনে করা হয়।
শাস্ত্রী মহাশয় বলেন, "শাস্ত্রমতে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান শুধু ব্যক্তি জীবনে নয়, রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে বিশ্বের একাধিক প্রান্তে যুদ্ধ-বিগ্রহের সূচনা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা এই রুদ্র সম্বৎসরের প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।"
জ্বালানি সংকটের পিছনের জ্যোতিষিক কারণ: গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল সমীকরণ
বর্তমান জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে কিছু অস্বাভাবিক ও বিরল গ্রহীয় অবস্থান। জয়দেব শাস্ত্রী এই অবস্থানগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন:
১. শনি ও মঙ্গলের সংযোগ (৩ এপ্রিল - ১০ মে): আগামী ৩ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত শনি এবং মঙ্গল একই রাশি মীনে অবস্থান করবে। জ্যোতিষশাস্ত্রে শনি শাসন ও শৃঙ্খলার কারক, আর মঙ্গল শক্তি ও আগ্রাসনের প্রতীক। এই দুই গ্রহের সংযোগ অত্যন্ত অশুভ বলে বিবেচিত হয়, যা তীব্র সংঘাত, প্রতিযোগিতা এবং জ্বালানি ও সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। শাস্ত্রী জানান, এই সময়কালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি নিয়ে টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।
২. রাহু-মঙ্গলের যুগলবন্দী (২ এপ্রিল পর্যন্ত): আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত রাহু (ছায়াগ্রহ) এবং মঙ্গল একত্রে কুম্ভ রাশিতে অবস্থান করছে। এই অবস্থান অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। রাহু বিভ্রান্তি ও আকস্মিক ঘটনার কারক, আর মঙ্গল যুদ্ধের কারক। এই যুগলবন্দী জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বাজারে অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
৩. সকল গ্রহ রাহু-কেতুর বন্ধনে: বর্তমানে চাঁদ ছাড়া প্রায় সবকটি গ্রহই রাহু ও কেতুর প্রভাবে আবদ্ধ। এই অবস্থান অত্যন্ত দুর্লভ এবং এটিকে জ্যোতিষশাস্ত্রে 'গ্রহণাত্মক অবস্থা' বলা হয়। যখন গ্রহগুলি এই বন্ধনে থাকে, তখন তাদের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী ব্যাহত হয়, যার ফলস্বরূপ বৈশ্বিক স্তরে নীতি-নির্ধারণ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দাম নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত হয়ে পড়ে।
কবে কমবে দাম? মুক্তির সম্ভাবনা ও সময়রেখা
জয়দেব শাস্ত্রীর মতে, জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা সম্পূর্ণভাবে কাটতে এখনও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে তিনি আশার কথা শুনিয়েছেন।
২০ এপ্রিলের পর প্রথম স্বস্তি: আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে শনি ও মঙ্গলের মধ্যকার কৌণিক দূরত্ব (ডিগ্রি) কমে আসবে। শাস্ত্রী বলেন, "২০ এপ্রিলের পর শনি ও মঙ্গল যখন পৃথক হতে শুরু করবে, তখন জ্বালানি নিয়ে সৃষ্ট ভোগান্তি কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সঙ্গে সঙ্গেই দাম কমে যাবে। এটি মূলত পরিস্থিতির স্থিতিশীলতার দিকে প্রথম পদক্ষেপ।"
জুন-জুলাই: মূল পরিবর্তনের সূচনা: জ্যোতিষী জয়দেব শাস্ত্রী জানান, রাহু-কেতুর এই জটিল বন্ধন থেকে প্রথম মুক্তি পাবে শুক্রগ্রহ। শুক্র আগামী জুলাই মাসে এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসবে। শুক্র হল অর্থনীতি, বিলাসিতা ও মূল্যবান ধাতু-জ্বালানির কারক। শুক্র যখন স্বাধীন অবস্থান লাভ করবে, তখন অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে কিছুটা হলেও স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে শুরু করবে। শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে, জুন-জুলাই মাসের দিকে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানির দাম কমানোর সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে।
কয়েক মাসের অপেক্ষা: জয়দেব শাস্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, "এই মুহূর্তে রান্নার গ্যাসের দাম হঠাৎ কমে যাবে বলে আশা না করাই ভাল। কারণ রাহু-কেতুর বন্ধন থেকে সব গ্রহকে বেরিয়ে আসতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। এই পুরো সময়কালটি খুবই অনিশ্চিত। আগামী কয়েক মাস অর্থাৎ জুন-জুলাই পর্যন্ত নানা ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। কারণ গ্রহদের স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই এই সমস্যাগুলির সমাধান হওয়ার পথও তৈরি হবে।"
উপসংহার: ধৈর্য ও জ্যোতিষিক দৃষ্টিভঙ্গি
জ্বালানি সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি মহাজাগতিক শক্তির প্রতিফলনও বটে। জ্যোতিষী জয়দেব শাস্ত্রীর বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, আগামী দু-তিন মাস এই বিষয়ে কিছু ওঠানামা থাকলেও, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। তাঁর পরামর্শ, এই সময়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের দিকনির্দেশনায় সচেতন থাকাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। গ্রহ-নক্ষত্রের পরিবর্তন যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনই সংকটের অবসানও সময়ের ব্যাপার মাত্র।